আর্থিক সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন পে স্কেল অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সরকার সে পথে না হেঁটে আগামী অক্টোবরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগেই নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে সংস্থাটি বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আরো দুই বছর স্থগিত রাখার পরামর্শ দেয়। তাদের যুক্তি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।সূত্র বলছে, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগেই গেজেট প্রকাশ করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় সরকার।
আর আইএমএফ চায় বিষয়টি অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষমাণ থাকুক, যাতে বার্ষিক সভায় এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যায়। পাশাপাশি নভেম্বরে সম্ভাব্য নতুন মিশন ঢাকায় এসে পে স্কেল ও নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আরো গভীরভাবে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু সরকার বিষয়টি দীর্ঘায়িত করতে আগ্রহী নয়।
এদিকে নতুন পে স্কেলের প্রস্তাবনা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ বিভাগ।
চলতি সপ্তাহের শেষদিকে কিংবা আগামী সপ্তাহের যেকোনো মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।
এরই অংশ হিসেবে গতকাল রবিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশ, আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়ন কৌশল এবং আইএমএফের আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, পে স্কেলসংক্রান্ত ফোকাল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখান থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। তবে এককালীন চাপ কমাতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে চলতি বাজেটে পে স্কেলের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা যথেষ্ট কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ সময় জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে জোরালো হয়ে উঠেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের অধীনে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবেন। মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। এর ফলে সরকারের পেনশন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। আইএমএফের আশঙ্কা, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় বড় আকারে বৃদ্ধি পাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ধারণা করছেন, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশন, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে ব্যয় হচ্ছে। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অধিক দক্ষতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘদিন বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেধাবী জনবল আকর্ষণ এবং কর্মীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য নতুন পে স্কেল প্রয়োজন।
এ কারণে অর্থ বিভাগ বিকল্প কয়েকটি বাস্তবায়ন মডেল নিয়েও কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি, নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কয়েক ধাপে আর্থিক প্রভাব সমন্বয়ের পরিকল্পনা। নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করলে এককালীন আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। অনুমোদন মিললে আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের পথ খুলে যাবে। তবে সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ না পাওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না।
Prothom Bd IN Biggest News Site